বিকেলের স্নিগ্ধ আলো যখন ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসছিল, তখন শত শত মানুষ সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলেন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতে। কেউ ক্যামেরাবন্দী করছিলেন মুহূর্তগুলো, কেউবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন বেলাভূমি ধরে। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে শুক্রবার পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়, যা পুরো এলাকাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। দুপুরের পর থেকেই জনসমাগম বাড়তে শুরু করে, দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে সমুদ্রপাড় সরগরম হয়ে ওঠে।
এই আনন্দঘন পরিবেশে ছোট মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইদ্রিস আলী। হঠাৎ দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তাঁর মেয়ে বলে উঠল, “বাবা দেখো, দূরে জাহাজ।” রাউজান উপজেলা থেকে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন ইদ্রিস আলী। মেয়ের জন্য তিনি বেলুন, খেলনা ও আইসক্রিম কিনেছেন। তিনি জানান, “ঈদের ছুটিতে মেয়েকে নিয়ে একটু ঘুরতে এসেছি। সমুদ্র দেখে ও খুব খুশি।” সৈকত থেকে তাকালেই সমুদ্রের বুকে নোঙর করা ছোট ছোট জাহাজ চোখে পড়ছিল, যা দেখে অনেক শিশু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল।
সৈকতের হাঁটার পথজুড়ে ছিল মানুষের অবিরাম স্রোত। কেউ পাথরের বাঁধে বসে সমুদ্রের বিশালতা উপভোগ করছিলেন, কেউ ছবি তুলছিলেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সাথে হাঁটছিলেন, আবার কেউ ঢেউয়ের কাছে গিয়ে মোবাইল ফোনে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ধরে রাখছিলেন। সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল শিশুরা। বেলুন হাতে দৌড়ঝাঁপ, ট্রেন রাইড, নাগরদোলা কিংবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে সৈকত ভ্রমণ—সব মিলিয়ে সেখানে এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছিল। শিশুদের হাসি আর কলরবে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।
নগর ভ্রমণে আসা সাত বন্ধুর একটি দলের সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ রিদুয়ান। তিনি নগরের নিউমার্কেট এলাকায় কর্মরত। বন্ধুদের সাথে ঈদের ছুটিতে বেরিয়ে তিনি বলেন, “কর্ণফুলী টানেল ঘুরে পতেঙ্গায় এসেছি। অনেক দিন পর সবাই একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছি।” কিছু পর্যটককে স্পিডবোটে চড়ে সমুদ্রের বুকে ঘুরে বেড়াতেও দেখা যায়।
বিকেলে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে আসছিল কাঁকড়া ফ্রাই, ঝালমুড়ি, চটপটি ও ভাজাপোড়ার লোভনীয় গন্ধ। খাবারের দোকানগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। কেউ কাঁকড়া ফ্রাইয়ের স্বাদ নিচ্ছিলেন, কেউ ফুডকোর্টে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আবার অনেকে ঝালমুড়ি কিংবা বাদামের ঠোঙা হাতে সমুদ্রের শোভা উপভোগ করছিলেন।
নগরের চকবাজার এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন মহিবুর রহমান। তাঁকে নাগরদোলার পাশে মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “বাচ্চারা অনেক দিন ধরে সমুদ্রে আসার জন্য বায়না করছিল। ঈদের ছুটিতে তাই সবাইকে নিয়ে চলে এলাম। ওদের আনন্দ দেখেই ভালো লাগছে।”
চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পৌঁছানো যায় একাধিক পথে। নগরের মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, বন্দর ও ইপিজেড হয়ে সরাসরি সড়কপথে সেখানে যাওয়া যায়। আবার ফৌজদারহাট বা হালিশহর হয়ে মেরিন ড্রাইভ ধরেও সৈকতে পৌঁছানো সম্ভব। সমুদ্রঘেঁষা এই সড়কের দুই পাশে জলরেখা, পাথরের বাঁধ আর ঢেউয়ের মন মুগ্ধ করা খেলা দেখা যায়। তাই অনেকেই গন্তব্যের পাশাপাশি পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যও এই সড়ক বেছে নেন।