বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে আট ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে এক বছরের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। নির্বাচনে খলিলুর রহমান নিরানব্বইটি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান একানব্বইটি ভোট।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল দশটায় জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে দুই প্রার্থীর পক্ষে তাদের রায় দেন। মোট ১৯০টি ভোট এই নির্বাচনে পড়েছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধিবেশন শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণ প্রদানের মধ্য দিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক পর্বের সূচনা হবে। এই অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সভাপতির ভূমিকা পালন করবেন। মঙ্গলবার নিউইয়র্কের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংস্থার মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, এই বিজয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের এক সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসলেন। এর আগে, আজ থেকে চল্লিশ বছর পূর্বে, ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদও অলংকৃত করেন। পরবর্তীতে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্বও পালন করেন।
সাবেক পেশাদার কূটনীতিক খলিলুর রহমান তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জেনেভা ও নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিভিন্ন সংস্থায় অতিবাহিত করেছেন। ১৯৯১ সালে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগদান করেন। এরপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রকাশনার প্রধান লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা জানিয়েছেন যে, ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ (আরএসএ) বা একে অপরকে ভোট দেওয়ার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতামূলক চুক্তির মাধ্যমেই এবারের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। এই পারস্পরিক সমর্থন আদায়ে বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকা থাকায় মাত্র তিন মাসের প্রচারণার পরেও দেশের প্রার্থী জয়ী হতে সক্ষম হয়েছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে এই পদের জন্য দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকেই পূর্ণোদ্যমে কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতির সুযোগ না থাকলেও, বাংলাদেশ এই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভে সফল হয়। অপরদিকে, বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে এবং এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল।
এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। একই সাথে, জাতিসংঘ ঘোষিত মূলনীতি ও উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।